শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৯ অপরাহ্ন
আবদুস সোবহান বাচচু ॥ বিশ্বজুড়ে অনাকাঙ্খিত করোনা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশেও প্রায় তিন মাস বন্ধ কিন্ডারগার্টেনসহ সরকারি-বেসরকারি সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সব বন্ধ থাকলেও সরকারি স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটির শিক্ষকদের বেতন বন্ধ ছিল না। কিন্তু ব্যক্তি উদযোগে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান? বিশেষ করে কিন্ডারগার্টেনগুলো এবং তাদের শিক্ষকরা কি অবস্থায় দিনাতিপাত করেছে সে খবর এর সাথে সংশ্লিষ্টরা ছাড়া অন্য কেউ কি রেখেছেন?
সরকারি নির্দেশে স্কুল বন্ধ ঘোষণার সাথে সাথেই বন্ধ হয়ে গেছে এসব প্রতিষ্ঠানের আয়ের পথ। সেই সাথে বন্ধ হয়ে গেছে আয় থেকে দায় শোধ প্রক্রিয়ায় চলা এসব প্রতিষ্ঠানের বাড়ি ভাড়া, শিক্ষক-কর্মচারিদের বেতনসহ নানাবিধ আনুষাঙ্গিক খরচ। কেবল যদি বন্ধ হয়ে যেত, তবে সে ক্ষেত্রে এক রকমের হিসাব। যখন এটি বকেয়া হয়ে গেল, তখন এর হিসাব মেলানো মোটেই সহজ সাধ্য নয়। প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতির পরিমান টাকার হিসাবে লক্ষ টাকায় গুনতে হবে। সারা বাংলাদেশের কিন্ডারগার্টেনগুলোর আর্থিক ক্ষতির পরিমান টাকার হিসাবে গুনতে হবে কোটি টাকায়।
কীভাবে যোগার হবে এ টাকার? কে দেবে..? এ প্রশ্নের উত্তর আপনি-আমি কেউই জানি না। কেবল জানি, বরাবরের মত আপনাকে-আমাকেই চরম মূল্য দিয়ে এ দায় শোধের ভার কাঁধে নিতে হবে। কেননা বিগত ৭০ বছরেও এ হতভাগ্য খাতটি কোনো নির্ভরযোগ্য সংগঠন তৈরি করতে পারেনি, নির্বাচন করতে পারেনি কোনো একক বা যৌথ নেতৃত্ব। যার ছায়াতলে নির্ভাবনায় সপে দেয়া যায় সন্তানসম আপন প্রতিষ্ঠানের নাম। যিনি বা যারা বিপদে বিপন্ন এ খাতটির জন্যে আপদকালিন সময়ে সরকারের কাছে জোর দাবী উত্থাপন করে ক্ষতি পুষিয়ে নেবার মত বা অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মত ন্যুনতম অর্থ সহায়তা আদায়ে সফল হবে। কিন্ডারগার্টেগুলোর অস্তিত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে। যা ছিল এই সময়ে দেশের সকল কিন্ডারগার্টেনের সাথে সম্পৃক্ত উদ্যোগক্তা-শিক্ষক-কমর্মচারির প্রাণের চাওয়া।
বাংলাদেশে কিন্ডারগার্টেনের সংখ্যা বলাটা যেমন মুশকিলের, ঠিক তেমনি মুশকিল এসব স্কুলের সংগঠনের সংখ্যা বলাটাও। সারা দেশে যেমন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেক কিন্ডারগার্টেন স্কুল, ঠিক তেমনি ভাবে প্রত্যেকটি অঞ্চলে আছে অনেক সংগঠন। নিজেদের মাপকাঠিতে যারা সবাই শ্রেষ্ঠ। নিজেদের ভাবনায় তারা সবাই রাজা।
যারা একবার রাজা হয়ে যান, তারা কখনোই নিজেদের জীবদ্দশায় প্রজা হতে চান না। আর সে কারণেই কোন ইস্পাতদৃঢ় ঐক্য গড়ে ওঠেনা কোন একক নেতৃত্বে। গন্তব্যে পৌঁছায় না কোন আবেদন, নিবেদন বা আন্দোলন। আর তাই আমাদের সকল সম্ভাবনা ও সক্ষমতা থাকার পরেও আমরা বার বার দুঃখজনকভাবে হেরে যাই সময়ের কাছে। রাজা তার রাজত্ব আঁকড়ে ধরে থাক। তবে প্রজাদের ভাববার সময় এসেছে, কোন রাজার ছায়াতলে তাদের জীবন সুখি, সাচ্ছন্দময় ও নিরাপদ থাকবে।
কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর অভাবের অন্ত নেই। স্কুল করার জন্যে যুতসই জায়গার অভাব। প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও তাদের স্থায়ীত্বের অভাব। সাচ্ছন্দে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করার মত টাকার অভাব। সরকারি সাহায্য বা অনুদানের অভাব। এসব প্রতিষ্ঠান ও তাদের শিক্ষক-কর্মচারিদের নিয়ে কল্যাণকর পদক্ষেপের অভাব। এক প্রতিষ্ঠান অন্য প্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতা, সহ্য বা সম্মান করার প্র্যাকটিসের অভাব। ভরসা করার মত সংগঠন ও বিশ্বাস করার মত নেতৃত্বের অভাব।
আর এই অভাবের সুযোগ নিয়ে বরাবরই আমাদের সকল অর্জনের গায়ে কালিমা লেপনের অপচেষ্টা চালাচ্ছে একটি মহল। সম্প্রতি বিবিসি জরিপে প্রকাশ, বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের ৬৫% বাংলা পড়তে পারেনা। সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার এই ব্যর্থতাকে আড়াল করতেই একটি মহল বহু বছর ধরে কিন্ডারগার্টেনগুলোকে প্রতিপক্ষ হিসাবে দাঁড় করিয়েছে। অথচ প্রতিপক্ষ না করে প্রতিযোগি করে নিলেই কেবল সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার এ দুরাবস্থার চিত্র পাল্টানো সম্ভব বলে মনে করেন অনেক বিজ্ঞজন।
এত অভাবে অন্ধকার যখন দশ দিগন্ত, তখন রবীন্দ্রনাথের কবিতার প্রতিফলনের মত দৃষ্টান্ত কি আমাদের নেই? নেই কি আশার আলো হাতে ফ্লোরোসেন্ট নাইটেঙ্গেলের মত পাশে এসে দাঁড়াবার মত সংগঠনও।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-
“কে লইবে কার্য্য মোর, কহে অস্ত রবি।
শুনিয়া জগৎ রহে নিরুত্তর ছবি।
মাটির প্রদীপ ছিল, সে কহিল স্বামী,
আমার যেটুকু সাধ্য, করিব তা আমি।
হ্যাঁ, সংকটের ঘোর অমানিশায় সূর্যের আলোর মত উজ্জ্বলতা দিতে না পারলেও ছোট্ট প্রদীপের আলোতে অন্ধকারের অহংকারকে চূর্ণ করা সম্ভব। সেই স্বল্প আলোতে চিনে নেয়া সম্ভব আমাদের আপনজনদের মুখ। একে একে হাজারো প্রদীপ শিখা নিশ্চই আমাদের কাঙ্খিত আলো এনে দিতে পারবে। যার আলোতে অন্ধকারকে বীদির্ণ করে একদিন লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে বিশ্বাস করি। আর বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহু দূর।
নিজেদের অস্তিত্ব, সমৃদ্ধি, নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও কল্যাণের দিক বিবেচনায় প্রত্যেকটি শ্রেণি-পেশার মানুষ একটি সাংগঠনিক বলয় নির্মান করে নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে। যে সংগঠন তাদের বৃহত্তর গোষ্ঠী ভিত্তিক স্বার্থ ও নিরাপত্তা বূহ্য হিসাবে কাজ করে। যে কোন দুর্যাগে আশ্রয় ও আক্রমনে ঢাল হিসাবে কাজ করে। আবার সোনালী সুদিনে হয় স্বপ্ন সারথী। পরিতাপের বিষয় কিন্ডারগার্টেনগুলোর ক্ষেত্রে তেমন কোন নির্ভরযোগ্য বৃহত্তর ঐক্য দৃশ্যমান হয়ে গড়ে ওঠেনি মূলতঃ নিজেদের অতি স্বাধীন, স্বাতন্ত্র ও অন্যের চেয়ে নিজেকে বেশি যোগ্য মনোভাবের কারনে। কিন্তু নিজেদের অবস্থান প্রকাশের প্রয়োজনে জন্ম নিয়েছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বহু সংগঠন। যারা কেবল আকারেই ক্ষুদ্র নয়, তাদের অনেকের আছে চিন্তার দৈন্য ও ভাবনার কূপমন্ডুকতা।
‘পেট মোটা হলেই দারোগা হয় না।’ এমন একটি কথা ছোট বেলা থেকেই শুনে আসলেও এখন কার্যত তার অর্থ অনুভব করছি। আগাছার স্তুপ যত বড় হোক না কেন, তা কারো কোন কল্যাণ বয়ে আনে না। আবার ‘ছোট মরিচের ঝাল বেশি।’ এমন একটি কথা শুনেও বড় হয়েছি আমরা। বহরে ক্ষুদ্রাতিকার হলেও যাদের বৃহত্তর সক্রিয় কর্মসূচি, কল্যাণকর সাংগঠনিক পদক্ষেপ, নিয়মিত ও নিরবিচ্ছিন্ন অনুশিলন আছে এমন সংগঠনকে বেছে নেবার সময় এসেছে কিন্ডারগার্টেনগুলোর দ্বারে। বিচার বিবেচনায় রাখা উচিত, একটি সংগঠন কেবল সদস্য সংখ্যার নীরিখে বড় হয় না। সংগঠন বড় হয় তাদের ব্যাপক, বিস্তৃত, গণমুখী ও নিরবিচ্ছিন্ন কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের নীরিখে। যে কোন পরিমন্ডলে মূল্যায়িত হয় তার ভলিউম অব ওয়ার্কের ভিত্তিতে। হয়তো আমাদের সবার জানা নেই, কিন্তু দেশে কিন্ডারগার্টেনগুলোর এমন সংগঠনও আছে যারা বিগত দিনে তাদের সদস্য স্কুলগুলোর মাঝে ল্যাপটপ, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, সিসিটিভি ক্যামেরাসহ নানাবিধ শিক্ষা উপকরণ বিনা মূল্যে প্রদান করেছে। কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিয়ে সময়পোযোগি করে গড়ে তুলছে।
শুধু তাই নয়, এসব কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর সকল শিক্ষকদের জন্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে নিয়মিত মাসিক প্রণোদনা ও উৎসব ভাতা প্রদান করে তাদেরকে নিজ নিজ পেশায় অন্তরিক করে তুলতে চেষ্টা করে যাচ্ছে। এমনকি কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকদের পেনশন নিয়েও নীতিমালা প্রণয়ণ ও প্রস্তুতিমূলক কাজ করে যাচ্ছে। এই করোনা কালের প্রতিকূলতা কাটিয়ে যারা টিকে যাবো তাদের একটি সঠিক সংগঠনের ছায়াতলে থাকাটা কেবল প্রয়োজন নয়, বুদ্ধিমত্তার পরিচায়কও বটে। আঁকড়ে ধরতে হলে সঠিক সংগঠনকেই শক্ত করে আঁকড়ে ধরা প্রয়োজন। ‘বড় প্রয়োজন সামনে এসেছে, ছোট প্রয়োজন ছাড়তে হবে। জীবন হচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্র, ভুল করলে হারতে হবে।
পৃথিবীতে যুগে যুগে আসা কলেরা, ক্যান্সার, এইডস, করোনার মত পরিস্থিতির সাথে লড়াই করেই আমাদের টিকে থাকতে হবে। মনে রাখবেন, ‘লড়াইয়ে কোন চূড়ান্ত পরাজয় নেই। সময়ের বাঁকে বাঁকে আশার দ্বীপ জাগে।”